
নবজাতকের আগমন জীবনে এক আনন্দের মুহূর্ত হলেও, এর সাথে কিছু চ্যালেঞ্জও আসে। নতুন বাবা-মায়ের জন্য সবচেয়ে সাধারণ সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি হলো শিশুকে কোলে না নিয়ে ঘুম পাড়ানো। যদি আপনি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, চিন্তার কিছু নেই! এই পোস্টে, আমরা এমন কিছু কার্যকর উপায় ও পরামর্শ শেয়ার করবো, যা আপনার নবজাতককে কোল ছাড়া আরামদায়ক ঘুমের অভ্যাস গড়তে সাহায্য করবে।
চ্যালেঞ্জটি বোঝা
নবজাতকরা ঘুমের সময় বাবা-মায়ের উষ্ণতা ও নিরাপত্তা খোঁজে – এটা একদম স্বাভাবিক। শিশুর কোলে ঘুম পছন্দ করা দোষের কিছু নয়, বরং অনেক বাবা-মায়ের কাছেই নবজাতকের ঘুমন্ত অবস্থায় জড়িয়ে রাখার মুহূর্তগুলো মনের মতোই প্রিয়। তবে সারাক্ষণ শিশুকে কোলে রেখে ঘুম পাড়ানো বেশ ক্লান্তিকর হতে পারে, বিশেষ করে যখন বাবা-মাকে নিজের বিশ্রামের কথাও ভাবতে হয়।”
নবজাতক যদি শুধু কোলে থাকলেই ঘুমায়, কী করবেন? ৫টি প্রধান কার্যকর কৌশল
১. ঘুমের নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করুন
একটা নিয়মিত ঘুমের রুটিন তৈরি করুন, যা আপনার শিশুর জন্য পরিচিত ও আরামদায়ক হবে। এটি শিশুকে সহজেই ঘুমিয়ে পড়তে সাহায্য করবে। নবজাতকদের জন্য এটি খুবই সাধারণ হতে পারে, যেমন:
- দুধ খাওয়ানো (বোতল/স্তন্যপান)
- ডায়াপার বদলানো
- স্লিপস্যাক পরানো
- বই পড়া বা একটু আদর করা
- সাউন্ড মেশিন চালু করা
- শিশুকে বিছানায় শোয়ানো
- একটি নির্দিষ্ট শুভরাত্রি কথা বলা (যেমন: “শুভরাত্রি, মা তোমাকে ভালোবাসে”)
- আলো বন্ধ করে কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসা
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিশু এই রুটিনটি চিনতে শিখবে এবং এটি তার ঘুমের সংকেত হয়ে যাবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী রুটিনে পরিবর্তন আনা যেতে পারে (যেমন: পরে দাঁত ব্রাশ করার অভ্যাস যোগ করতে হবে)।
২. শিশুকে ঘুম পাড়াতে সাহায্য করুন, কিন্তু সহায়তা ধীরে ধীরে কমান
নবজাতকদের ঘুমাতে সহায়তা দরকার – যেহেতু আপনি এটি পড়ছেন, নিশ্চয়ই জানেন যে কোলে ঘুম পাড়ানোও একটি ধরনের সহায়তা। এছাড়াও, খাওয়ানোর মাধ্যমে ঘুম পাড়ানো, দোলানো ইত্যাদির মাধ্যমেও শিশুকে ঘুমানোতে সাহায্য করা হয়। তবে আপনি ধীরে ধীরে এই সহায়তার পরিমাণ কমিয়ে আনতে পারেন, যাতে একসময় শিশু নিজেই ঘুমিয়ে পড়তে পারে।
একটি সহজ পদ্ধতি হলো – শিশুকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ানো, তবে উঁচুতে ধরে না রেখে তাকে অনুভূমিকভাবে (পিঠের উপর) রাখতে অভ্যস্ত করা। এতে শিশুর শরীর এখনও আপনার উষ্ণতা পাচ্ছে, কিন্তু সে এমন ভঙ্গিতে থাকছে, যা ক্রমে তাকে বিছানা বা ব্যাসিনেটে নিজে নিজে ঘুমানোর অভ্যাস গড়তে সাহায্য করবে।
৩. দিনে অন্তত একবার বিছানা বা ব্যাসিনেটে ঘুমানোর অভ্যাস করান
অনেক নতুন দক্ষতা ও অভ্যাসের মতোই, শিশুরও নতুন পরিবেশে ঘুমানোর জন্য অনুশীলন দরকার। নবজাতকরা জীবনের শুরুতেই শেখার প্রক্রিয়ায় থাকে, তাই একটু চর্চার মাধ্যমেই তারা নতুন অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে।
আমি সাধারণত নবজাতকের প্রথম দিন থেকেই দিনে অন্তত একটি ঘুম বিছানা বা ব্যাসিনেটে দেওয়ার পরামর্শ দিই। এটি শিশুর জন্য একটি নিরাপদ, স্বাধীন ঘুমের পরিবেশ তৈরি করবে এবং তাকে হাতের বাইরে ঘুমাতে শেখাবে। শুরুতে অন্য সময় কোলে ঘুমালেও, দিনে অন্তত একবার বিছানায় বা ব্যাসিনেটে ঘুমানোর অভ্যাস শিশুকে আস্তে আস্তে এতে স্বাচ্ছন্দ্য এনে দেবে। এতে আপনার লক্ষ্য – শিশুর স্বাভাবিকভাবে বিছানায় ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তোলা – সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
৪. শিশুর ঘুমানোর সংকেত বুঝুন এবং ক্লান্ত থাকলেই ঘুম পাড়ান
আমি সবসময় পরামর্শ দিই, যখন শিশু ক্লান্ত থাকে তখনই তাকে স্বাধীনভাবে ঘুমাতে শেখানোর চেষ্টা করুন। কিন্তু কীভাবে বুঝবেন যে শিশুটি এখন ঘুমানোর জন্য প্রস্তুত? এর জন্য আপনাকে শিশুর ক্লান্তির সংকেতগুলো চিনতে শিখতে হবে।
সেরা সময় হলো যখন আপনি অন্তত একটি বা দুটি ক্লান্তির সংকেত লক্ষ্য করবেন। যদি শিশু ক্লান্ত না থাকে, তাহলে তাকে নিজের ঘুমের জায়গায় শোয়ানোর চেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। তাই শিশুর ঘুমের সংকেতগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং সঠিক সময়ে ঘুম পাড়ানো তার ঘুমের অভ্যাস গঠনে সহায়ক হবে।
৫. শিশুর ঘুমের পরিবেশ উপযুক্ত করুন
আপনার কোলে ছাড়াও শিশুর জন্য আরামদায়ক ঘুমের পরিবেশ তৈরি করুন। আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস (AAP) এর সুপারিশ অনুযায়ী, শিশুকে একা, পিঠের ওপর শোয়ানো অবস্থায়, একটি শক্ত সমতল গদিতে, অন্ধকার ও শান্ত পরিবেশে ঘুমানো নিশ্চিত করুন।
আমি আমার চার নবজাতকের ক্ষেত্রেই দেখেছি যে সাউন্ড মেশিন এবং সুয়াডল (আঁটসাঁট কম্বল) ব্যবহার করলে শিশু সহজেই আরাম পায় এবং এটি তাদের মাতৃগর্ভের মতো সুরক্ষিত অনুভূতি দেয়। ফলে তারা ভালো ঘুমাতে পারে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনভাবে ঘুমানোর অভ্যাস তৈরি হয়।
এই কৌশলগুলো অনুসরণ করে, এখন আপনি আপনার নবজাতককে নিরাপদ ও আরামদায়কভাবে নিজের ঘুমের জায়গায় ঘুমানোর অভ্যাস করাতে প্রস্তুত। শুধু কোলে নিয়েই ঘুম পাড়ানোর বদলে, ধৈর্য ধরে এবং উপরের টিপসগুলো প্রয়োগ করে, আপনি এবং আপনার শিশু—দুজনেই বেশি বিশ্রাম নিতে পারবেন।
আরও বিস্তারিতভাবে নবজাতকের স্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলার উপায় জানতে চাইলে, আমাদের নবজাতকের ঘুমের টিপস গাইড দেখুন।
যদি আপনার মনে হয়, নবজাতকের ঘুম আরও ভালো করতে আপনাকে বাড়তি সহায়তা দরকার, তাহলে আমাদের “Better Baby Sleep” গাইড আপনার জন্য সহায়ক হতে পারে। এখানে আরও কার্যকরী কৌশল, ধাপে ধাপে নির্দেশনা, এবং শিশুর জন্য সহজ ও কান্নাবিহীন ঘুমের অভ্যাস তৈরির উপায় দেওয়া হয়েছে। এসব কৌশল অনুসরণ করে, আপনি নবজাতকের ঘুম নিয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী হতে পারবেন এবং এই বিশেষ সময়টি উপভোগ করতে পারবেন—আরো বেশি ঘুমের সঙ্গে!