
একজন অভিভাবক হিসেবে আমরা প্রতিদিন নানা পরামর্শ ও টিপসের সম্মুখীন হই—কীভাবে শিশুকে সহজে ঘুম পাড়ানো যায়, কোন পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর, বা কোন অভ্যাস শিশুর ঘুমের মান উন্নত করতে পারে। তবে, অনেক পদ্ধতিই বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষিত নয় বা কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়নি।
কিন্তু একটি প্রাচীন ও স্বীকৃত পদ্ধতি রয়েছে, যা বৈজ্ঞানিকভাবেও প্রমাণিত যে এটি শিশুর ঘুমের জন্য অত্যন্ত উপকারী—আর তা হলো শিশুর ম্যাসাজ। বাবা-মায়ের স্নেহভরা কোমল স্পর্শ শুধু শিশুর ঘুমের মান উন্নত করে না, বরং অভিভাবক ও শিশুর মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলে।
এই ব্লগে আমরা আলোচনা করবো—
✔ কীভাবে শিশুর ঘুমের রুটিনে ম্যাসাজ অন্তর্ভুক্ত করা উপকারী হতে পারে
✔ এর পেছনের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কী
✔ এবং কীভাবে সঠিকভাবে শিশুকে ম্যাসাজ করা যায়
চলুন, শিশুর আরামদায়ক ও গভীর ঘুম নিশ্চিত করতে ম্যাসাজের গুরুত্ব সম্পর্কে আরও জানি!
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় শিশুর ম্যাসাজের প্রভাব
শিশুর ম্যাসাজ শুধু ভালোবাসার প্রকাশ নয়, এটি শিশুর ঘুমের মান উন্নত করতে ও অভিভাবক-শিশুর বন্ধনকে দৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, স্পর্শ—বিশেষ করে ম্যাসাজ ও ত্বক-থেকে-ত্বকের সংযোগ (যাকে কাংগারু কেয়ারও বলা হয়)—শিশুর আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, স্পর্শ শিশুদের মস্তিষ্কে নিউরোট্রান্সমিটার যেমন কোলেসিস্টোকিনিন এবং ওপিওইডস নিঃসরণে সহায়তা করে, যা তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে (Weller & Feldman, 2003)। এর ফলে শিশুর মন শান্ত হয়, যা ঘুমের রুটিনকে আরও স্বস্তিদায়ক ও কার্যকর করে তুলতে পারে।
গবেষণায় কী উঠে এসেছে?
📌 ঘুম ও মুড উন্নতিতে ম্যাসাজের প্রভাব
একটি গবেষণায় ১২৩ জন মা ও ৩-১৮ মাস বয়সী শিশুর ওপর একটি র্যান্ডমাইজড ট্রায়াল পরিচালিত হয়। এতে দেখা যায়, যেসব মায়েরা ঘুমানোর আগে শিশুকে ম্যাসাজ করতেন, তাদের শিশুরা সহজে ঘুমিয়ে পড়ত, রাতের ঘুম উন্নত হতো এবং সকালে ভালো মেজাজে থাকত। অন্যদিকে, যেসব শিশুরা ম্যাসাজ পায়নি, তাদের তুলনায় এই শিশুরা অনেক বেশি প্রশান্তিতে ছিল (Mindell et al., 2018)।
📌 শিশুর ঘুমের স্থায়িত্ব ও অভিভাবকের সঙ্গে বন্ধন
একইভাবে, ১২০ জন মা ও ৩-৬ মাস বয়সী শিশুর ওপর পরিচালিত আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে যে ম্যাসাজ শুধু ঘুমের স্থায়িত্ব বাড়ায় না, বরং রাতের জাগ্রত হওয়ার সংখ্যা ও সময়ও কমিয়ে দেয়। পাশাপাশি, এটি মা ও শিশুর মধ্যে আত্মিক সম্পর্ককে আরও গভীর করে তোলে (Hartanti et al., 2019)।
শুধু নবজাতক নয়, ছোট শিশুদের (টডলারদের) জন্যও ম্যাসাজ উপকারী হতে পারে! এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু ও টডলাররা এক মাস ধরে প্রতিদিন ১৫ মিনিটের ম্যাসাজ পেয়েছে, তারা দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েছে এবং তাদের ঘুমের মান উন্নত হয়েছে। এমনকি, তারা দিনে আরও আনন্দময় ও সক্রিয় সময় কাটিয়েছে। অন্যদিকে, যেসব শিশুরা ঘুমানোর সময় শুধু বই পড়ার রুটিন অনুসরণ করেছে, তাদের তুলনায় ম্যাসাজ পাওয়া শিশুরা অনেক ভালো ঘুমের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে (Field & Hernandez-Reif, 2001)।
উপরোক্ত গবেষণাগুলোর মাধ্যমে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, নিয়মিত শিশুর ম্যাসাজ শুধু ভালো ঘুম নিশ্চিত করে না, বরং শিশুর আবেগ নিয়ন্ত্রণ, মানসিক প্রশান্তি ও মা-বাবার সঙ্গে সংযুক্তি আরও দৃঢ় করে। তাই, শিশুর ঘুমের রুটিনে ম্যাসাজ যোগ করা হতে পারে এক কার্যকরী ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত উপায়!
কীভাবে শিশুকে ম্যাসাজ করবেন
শিশুর ঘুমের রুটিনে ম্যাসাজ অন্তর্ভুক্ত করা একটি দারুণ উপায়, যা খেলার সময় থেকে ঘুমের দিকে ধীরে ধীরে শিশুকে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। এটি শিশুর জন্য স্বস্তিদায়ক এবং ঘুমের একটি পরিচিত পরিবেশ তৈরি করে।
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ৫-১০ মিনিটের ম্যাসাজ শিশুর জন্য উপকারী হতে পারে। একই সময়ে ম্যাসাজ করার ফলে শিশুর মনে স্বাভাবিকভাবে ঘুমানোর সংকেত তৈরি হয়, যা তাকে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে সাহায্য করে।
ধাপে ধাপে শিশুর ম্যাসাজ করার উপায়
✅ সঠিক সময় বেছে নিন:
শিশুর গোসলের পর, কিন্তু পায়জামা পরানোর আগে ম্যাসাজ করুন। এটি খেলা থেকে বিশ্রামের দিকে শিশুকে সহজে নিতে সাহায্য করে।
✅ শান্ত ও আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করুন:
ঘরের আলো মৃদু করুন, নরম সঙ্গীত চালান এবং ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক রাখুন। চাইলে শিশুর প্রিয় খেলনা বা লোভি (নরম কাপড়ের পুতুল বা কমফোর্ট ব্ল্যাংকেট) ব্যবহার করতে পারেন, যা শিশুকে নিরাপদ অনুভব করতে সাহায্য করবে।
✅ বেবি-ফ্রেন্ডলি তেল ব্যবহার করুন (ঐচ্ছিক):
শিশুর ম্যাসাজের জন্য তেল ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক নয়। তবে যদি ব্যবহার করেন, তাহলে হাইপোঅ্যালার্জেনিক, সুগন্ধহীন এবং নন-মিনারেল তেল বেছে নিন। ম্যাসাজের আগে হাতে একটু তেল নিয়ে হালকা ঘষে নিন, যাতে তেল উষ্ণ হয়ে যায় এবং ম্যাসাজ আরামদায়ক হয়।
✅ শিশুর অবস্থান ঠিক করুন:
শিশুকে কোমল ও নিরাপদ স্থানে রাখুন, যেমন বিছানা বা চেঞ্জিং ম্যাট। আপনার হাত উষ্ণ করতে আগে হালকা ঘষে নিন, যাতে স্পর্শ আরামদায়ক হয়।
✅ সঠিক ম্যাসাজ পদ্ধতি অনুসরণ করুন:
- প্রথমে পা থেকে শুরু করুন, এরপর আস্তে আস্তে উপরের দিকে যান।
- কোমলভাবে শিশুর চামড়ায় হাত বোলান ও হালকা চাপ প্রয়োগ করুন।
- শিশুর প্রতিক্রিয়ার দিকে নজর রাখুন—যদি সে স্বস্তিবোধ না করে, তবে চাপ কমিয়ে দিন।
- মাথার নরম অংশ (ফন্টানেল) এড়িয়ে চলুন।
✅ চোখের যোগাযোগ রাখুন ও কথা বলুন:
শিশুর সঙ্গে চোখে চোখ রাখুন এবং নরম স্বরে কথা বলুন বা গান গাইতে পারেন। আপনি বলতে পারেন,
“আজ তুমি অনেক মজা করেছো, এখন আরাম করার সময় হয়েছে।”
এতে শিশুর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে এবং সে নিরাপদ অনুভব করবে।
ম্যাসাজ সব সমস্যার সমাধান নয়, তবে এটি সহায়ক!
ম্যাসাজ শিশুর ঘুম ও মানসিক প্রশান্তিতে সহায়ক হলেও, এটি সব ধরনের ঘুমের সমস্যার সমাধান নয়। যদি আপনার শিশুর ঘুমের সমস্যা জটিল হয়, তাহলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন। আমরা এক-টু-ওয়ান কনসালটেশন ও স্লিপ ক্লাস অফার করি, যেখানে বিভিন্ন ঘুমের সমস্যা সমাধানের জন্য প্রমাণিত পদ্ধতি শেখানো হয়। আমাদের ক্লাসে ইতোমধ্যে অনেক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া এসেছে, এবং আপনি চাইলে আমাদের প্রাইভেট ফেসবুক গ্রুপেও যোগ দিতে পারেন, যেখানে অন্যান্য অভিভাবকদের কাছ থেকেও সহায়তা পাবেন।
শিশুর ঘুম আরও ভালো করতে চাইলে, আজই ম্যাসাজের অভ্যাস শুরু করুন! 💜
References
- Mindell, J.A., Lee, C.I., Leichman, E.S., & Rotella, K.N. (2018). Massage-based bedtime routine: impact on sleep and mood in infants and mothers. Sleep Medicine, 41, 51-57.
- Weller, A., & Feldman, R. (2003). Emotion regulation and touch in infants: the role of cholecystokinin and opioids. Peptides, 24(5), 779-788.
- Field, T., & Hernandez-Reif, M. (2001). Sleep problems in infants decrease following massage therapy. Early Child Development and Care, 168(1), 95-104.
- Hartanti, A.T., Salimo, H., & Widyaningsih, V. (2019). Effectiveness of infant massage on strengthening bonding and improving sleep quality. Indonesian Journal of Medicine, 4(2), 165-175.