
কিছু শিশুরা খুব ছোট বয়স থেকেই পুরো রাত ঘুমায়। তবে, কিছু শিশুরা ৯ মাস বা তার বেশি সময় পর্যন্ত মাঝরাতে খেতে পারে। কিছু অভিভাবক “Dream Feed” ব্যবহার করে তাদের শিশুকে বেশি সময় ঘুমানোর জন্য সাহায্য করেন, আবার কিছু অভিভাবক এটিকে পছন্দ করেন না। কিন্তু, Dream Feed কী? এবং কোন বয়সে এটি চেষ্টা করা উচিত?
Dreem Feed আসলে কী?
ড্রিম ফিড হলো ঘুমানোর আগে আপনার শিশুকে ঘুম থেকে না জাগিয়ে খাওয়ানোর পদ্ধতি। এর ফলে শিশুটি মাঝরাতে না জেগে দীর্ঘ সময় ঘুমাতে পারে।
অনেক মা ঘুমানোর আগে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান, আবার কিছু অভিভাবক বা তাদের সঙ্গী বোতলের দুধ খাওয়ান, কখনো শিশুকে কোলে না তুলেই।
এই পদ্ধতির উদ্দেশ্য হলো, আপনার নিজের ঘুমের সময়ও কিছুটা বাড়ানো। ধরুন, আপনার শিশু ৫ ঘণ্টা খাওয়া ছাড়া থাকতে পারে, আর সে যদি রাত ৭টায় ঘুমায়, তাহলে আপনাকে রাত ১২টায় তাকে খাওয়াতে হবে। এতে আপনার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে, কারণ আপনি হয়তো রাত ১০টায় ঘুমিয়েছেন।
ফলে, আপনি মাত্র ২ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পান।
কিন্তু, যদি আপনি রাত ১০টায় তাকে খাওয়ান, তাহলে সম্ভবত সে রাত ৩টায় পর্যন্ত জেগে উঠবে না। এতে আপনি এবং আপনার শিশু দুজনেই ৫ ঘণ্টার টানা ঘুম পেতে পারেন।
এখন প্রশ্ন হলো:
- এটি কি ভালো পদ্ধতি?
- এটি কি সত্যিই কাজে দেবে?
- এবং, এটি কি আপনার করা উচিত?
কিছু অভিভাবকের জন্য ড্রিম ফিড অনেক উপকারী হতে পারে। আবার, সবার ক্ষেত্রে এটি কার্যকর নাও হতে পারে। চলুন, এটি নিয়ে আরও বিস্তারিত জানি!
Dreem Feed কোন বয়সে করবেন?
অনেক অভিভাবক ৬-৮ সপ্তাহ থেকে ৪ মাসের মধ্যে ড্রিম ফিড শুরু করেন, যখন রাতে প্রতি ৩ ঘণ্টা পরপর শিশুর খাওয়ার দরকার পড়ে না। তবে, ৬ মাস বয়সেও ড্রিম ফিড শুরু করা দেরি নয়, কারণ এই সময়ে অনেক শিশুর ক্যালোরির চাহিদা বেড়ে যায়।
বেশিরভাগ অভিভাবক ড্রিম ফিড চালিয়ে যান যতক্ষণ না নিশ্চিত হন যে তাদের শিশু খাওয়া ছাড়া পুরো রাত (১১-১২ ঘণ্টা) ঘুমাতে পারছে। তাই, যদি রাতের খাওয়া বন্ধ করার চেষ্টা কাজ না করে, তবে ৮ মাস বয়সেও ড্রিম ফিড শুরু করতে পারেন।
তবে মনে রাখবেন, আপনার শিশু যদি এখনো ড্রিম ফিডের জন্য প্রস্তুত না হয় এবং আপনি এটি বন্ধ করেন, তাহলে সে হয়তো খুব সকালে ঘুম থেকে উঠতে শুরু করবে।
আমার ১৫+ বছরের অভিজ্ঞতায়, বেশিরভাগ ফর্মুলা বা বোতলে দুধ খাওয়ানো শিশু সাধারণত ৬-৮ মাসে ড্রিম ফিড বন্ধ করতে পারে। আর বুকের দুধ খাওয়ানো শিশুরা সাধারণত ৯-১২ মাসে এটি বন্ধ করতে পারে।
Dreem Feed কীভাবে করবেন?
ড্রিম ফিড করতে হলে আপনার শিশুকে ঘুম থেকে না জাগিয়ে খাওয়াতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনার ৫ মাস বয়সী শিশু রাত ৭টায় ঘুমিয়ে পড়ে, তাহলে আপনি রাত ১০টায় ঘুমানোর আগে তাকে খাওয়ান। এরপর আপনার শিশু হয়তো ভোর ৪টা বা ৬টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকবে। এতে আপনি টানা ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পাবেন।
যদি আপনি আগেই ঘুমিয়ে পড়েন, তাহলে আপনার সঙ্গী বা স্বামী ড্রিম ফিড দিয়ে দিতে পারেন। এতে আপনার ঘুমের সময় আরও বাড়বে।
যদি খাওয়ানোর সময় শিশুটি জেগে ওঠে, তখন তাকে শান্ত করে আবার ঘুম পাড়িয়ে দিন। তবে, শিশুকে ড্রিম ফিডে অভ্যস্ত হতে কয়েক রাত সময় লাগতে পারে।
যদি এটি সঠিকভাবে কাজ করে, ড্রিম ফিড সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং এটি আপনার জন্য একটি দারুণ অভ্যাস হতে পারে।
Dreem Feed -এর একটি উদাহরণ:
এখানে ড্রিম ফিড সঠিকভাবে কাজ করার একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া হলো:
- আপনার শিশুটি প্রতিদিনের নিয়মিত রাতের রুটিন শেষে রাত ৭টায় ঘুমিয়ে পড়ে।
- আপনি রাত ১০টায় ঘুমানোর আগে তাকে ড্রিম ফিড দেন।
- এরপর শিশুটি ভোর ৪টা বা ৬টা পর্যন্ত বা তারও বেশি সময় ঘুমায়। এতে আপনি টানা ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা আরামদায়ক ঘুমানোর সুযোগ পাবেন।
- শিশুটি যখন আরও বড় হবে, তখন হয়তো পুরো রাত একটানা ঘুমাতে শিখে যাবে।
কতটায় Dreem Feed করবেন?
ড্রিম ফিড দেওয়ার সময় নির্ভর করে আপনার শিশুর ঘুমের রুটিন এবং আপনার নিজের সময়ের ওপর।
সাধারণত ড্রিম ফিড রাত ১০টা থেকে ১১:৩০টার মধ্যে দেওয়া হয়, যা শিশুর ঘুমানোর আগের খাওয়ানোর সময় থেকে অন্তত ৩ ঘণ্টা পরে করা হয়। এটি তখনই কার্যকর হয়, যদি আপনার শিশু ৬টা থেকে ৮টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে এবং আপনি ১০টা থেকে ১১:৩০টার মধ্যে ঘুমাতে যান।
যদি আপনার শিশু রাত ৮টায় ঘুমায় এবং আপনি ৯টায় ঘুমাতে যান, তাহলে এই সময়ে ড্রিম ফিড দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।
কিছু অভিভাবক ভোরের দিকে, ৪টা থেকে ৬টার মধ্যে ড্রিম ফিড দেওয়ার কথা ভাবেন, যদি শিশুকে খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠা বন্ধ করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, আপনার শিশু হয়তো ভোর ৫টায় জেগে ওঠে। এটি এড়াতে আপনি ৩টা বা ৪টায় অ্যালার্ম দিয়ে তাকে খাওয়াতে পারেন, যাতে সে ৬টা বা ৭টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকে।
সম্পূর্ণ নাকি আংশিক খাওয়ানো? কতটুকু খাওয়াবেন?
ড্রিম ফিডে শিশুকে পুরো খাবার দেবেন নাকি অল্প খাবারই যথেষ্ট হবে, তা নির্ভর করে তার প্রয়োজনের ওপর।
যদি আপনার শিশু দিনের বেলায় কিছুটা কম খেয়ে থাকে, তাহলে আংশিক খাওয়ানোই যথেষ্ট হতে পারে। হয়তো তার বেশি খাবারের প্রয়োজন নেই এবং কিছুটা খাওয়ানোর পরও সে পুরো রাত ঘুমাবে।
বুকের দুধ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে:
- ৫ মিনিটের খাওয়ানো বা শুধু একটি স্তন দিলেই যথেষ্ট হতে পারে।
ফর্মুলা খাওয়ানোর ক্ষেত্রে: - বোতলে প্রায় ৩ আউন্স দুধ আংশিক খাওয়ানো হিসেবে ধরা হয়।
যদি আপনার শিশু এর চেয়েও কম খাবারের প্রয়োজন অনুভব করে, তাহলে সম্ভবত এটি ড্রিম ফিড বন্ধ করার সঠিক সময়।
তবে, কিছু ক্ষেত্রে আংশিক খাওয়ানোতে ড্রিম ফিড সফল নাও হতে পারে। এতে শিশুটি রাতে বা ভোরবেলায় জেগে উঠতে পারে।
সম্পূর্ণ খাওয়ানো:
যদি আপনার শিশুর এখনও রাতে খাওয়ার প্রয়োজন হয়, তাহলে ড্রিম ফিডে সম্পূর্ণ খাওয়ানো করাই ভালো।
- সম্পূর্ণ খাওয়ানো বলতে বোঝায়:
- ফর্মুলা: ৬-৭ আউন্সের পুরো বোতল।
- বুকের দুধ: ৪-৫ আউন্স বোতল বা দুই স্তন থেকে খাওয়ানো।
যদি আপনার শিশু এখনো ছোট হয় এবং বড় পরিমাণে খাওয়ার জন্য প্রস্তুত না হয়, তবে তার খাবারের পরিমাণ ছোট হবে। সহজভাবে বললে, ড্রিম ফিডটি তার সাধারণ দিনের খাবারের সমান হওয়া উচিত।
শিশুকে কি কোলে নিতে হবে?
যদি আপনি বুকের দুধ খাওয়ান, তাহলে অবশ্যই শিশুকে কোলে নিতে হবে। অন্যভাবে এটা করা সম্ভব নয়!
কিন্তু, যদি আপনার শিশু বোতলে ফর্মুলা বা বুকের দুধ খায়, তাহলে অনেক সময় তারা বিছানায় শুয়ে বোতল শেষ করে ঘুমিয়েই থাকে। এ ক্ষেত্রে তাদের কোলে তোলার দরকার হয় না, আর এতে তাদের ঘুমও ভাঙে না।
তবে শিশুকে কোলে না নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। বেশিরভাগ শিশুই কোলে নিলে ঠিক থাকে। আপনি এমনটি করুন যা আপনার শিশুর ঘুম ঠিক রেখে দ্রুত খাওয়ানোর কাজ শেষ করতে সাহায্য করে।
শিশুকে কি Burp করাতে হবে?
হ্যাঁ, ড্রিম ফিডের পরও শিশুকে ডাকার করানো উচিত। তবে মনে রাখবেন, শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় তাদের ডাকানোর প্রয়োজন কমে যায়। তাই হতে পারে, ডাকানোর চেষ্টা করলেও শিশুটি ডাকবে না।
তবুও, খাওয়ানোর সাধারণ সময়ে আপনি যতটুকু সময় ডাকানোর জন্য দেন, ড্রিম ফিডের পরও ঠিক ততটুকু সময় দিন। এতে শিশুর আরাম হবে।
Dream Feed কি কাজ করে?
কখনো কাজ করে, কখনো আবার করে না।
যেমনটি বলা হয়েছে, ৪ মাস বয়সের পর শিশুর ঘুমের প্রথম অংশ সবচেয়ে গভীর হয়। তাই এই সময়ে আপনার শিশুকে খাওয়ানোর জন্য জাগানো বেশ কঠিন হতে পারে।
কিছু শিশুকে সামান্য জাগানোই যথেষ্ট, তারা খেয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। তবে কিছু শিশু ঠিকমতো জাগে না, আর কিছু শিশু অতিরিক্ত জেগে যায়, যা তাদের বিরক্ত করতে পারে (বিশেষত যদি তারা ক্ষুধার্ত না থাকে)।
ড্রিম ফিড সাধারণত ৬ মাসের কম বয়সী শিশুদের জন্য বেশি কার্যকর, যাদের রাতে একাধিকবার খাওয়ার প্রয়োজন হয়। এর “সময়সীমা” থাকতে পারে, মানে শিশুর বয়স বাড়ার সাথে সাথে এটি তেমন কার্যকর নাও হতে পারে।
কখনো কখনো ড্রিম ফিড তখনও কাজ করে না, যখন আপনি রাতে ঘুমানোর আগে শিশুকে খাওয়ান, কিন্তু তারপরে শিশুটি এক-দুই ঘণ্টার মধ্যেই জেগে ওঠে।
এছাড়া, কিছু শিশুর ক্ষেত্রে ড্রিম ফিড দেওয়ার পর তারা রাতে আরও বেশি ঘন ঘন জেগে ওঠে, যা ড্রিম ফিডের উদ্দেশ্যের বিপরীত কাজ করে।
এই জন্য, ড্রিম ফিড আপনার শিশুর জন্য কার্যকর হবে কি না, তা নির্ভর করে তার ঘুমের অভ্যাস এবং প্রয়োজনের ওপর।
আপনার কি ড্রিম ফিড করা উচিত?
ড্রিম ফিড সব পরিবারের জন্য উপযুক্ত সমাধান নয়, তবে এটি কিছু শিশুর জন্য বেশ ভালো কাজ করে। শেষ পর্যন্ত, প্রতিটি শিশুর জন্য তার নিজস্ব “সঠিক” সমাধান খুঁজে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি একই পরিবারের ভিন্ন শিশুর জন্যও।
কিছু মানুষ মনে করেন, ড্রিম ফিড ডিমান্ড-ফিডিংয়ের ধারণার সঙ্গে যায় না এবং শিশুকে জোর করে খাওয়ানো মানে তাকে সম্মান না করা। যদি এটি আপনার কাছে “ভুল” মনে হয়, তাহলে এটি এড়িয়ে চলুন। তবে, যদি আপনি মনে করেন এটি আপনার শিশুর উপকারে আসবে এবং আপনাকেও সাহায্য করবে, তাহলে একবার চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
শিশুর পেট ছোট, এবং আমি সব সময় বলি, অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও ১১-১২ ঘণ্টা খাওয়া ছাড়া থাকতে পারে না। তাহলে আমরা কেন শিশুদের কাছ থেকে এমন আশা করি?
যদি আপনি ড্রিম ফিড না করার সিদ্ধান্ত নেন বা এটি কাজ না করে, তাহলে আমি সাধারণত পরামর্শ দিই শিশুর বয়স এবং তার সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে রাতে খাওয়ানোর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমানোর (নাইট-উইনিং) চেষ্টা করুন।
Dream Feed কীভাবে বন্ধ করবেন?
যখন আপনি বুঝবেন যে আপনার শিশু ড্রিম ফিড বন্ধ করার জন্য প্রস্তুত, যা সাধারণত ৬ থেকে ১০ মাসের মধ্যে হয়, তখন এটি ধীরে ধীরে বন্ধ করাই সবচেয়ে সহজ উপায়।
যদি আপনি বোতলে দুধ খাওয়ান, তাহলে প্রতিদিন ১ আউন্স কমিয়ে ৩-৪ দিনের মধ্যে ড্রিম ফিড পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেন। আর যদি আপনি বুকের দুধ খাওয়ান, তাহলে প্রতিদিন ১ মিনিট আগে শিশুকে বুক থেকে ছাড়ানোর (আনল্যাচ) চেষ্টা করুন।
এই পদ্ধতিতে শিশুটি ধীরে ধীরে কম খেতে অভ্যস্ত হবে এবং দিনে বেশি খাওয়া শুরু করবে। একসময় তার ড্রিম ফিডের আর প্রয়োজন হবে না।
আশা করি, এই লেখা আপনাকে ড্রিম ফিডের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। আপনার এবং আপনার শিশুর জন্য শুভকামনা!